logo

শিশুকে বাবা-মায়ের উপহার সিগারেট


শিশুকে বাবা-মায়ের উপহার সিগারেট

ভাবতে পারেন আপনারই সামনে আপনার পাঁচ বছরের ছেলেটা কিংবা মেয়েটা ফস করে দেয়াশলাই জ্বেলে সিগারেট ধরাল। তারপর ভোস ভোস করে আপনার মুখের ওপর ধোঁয়া ছেড়ে বলল, ‘আজকে ভীষণ ঠান্ডা পড়েছে তাই না?’


আপনার কাছে অকল্পনীয় মনে হলেও পর্তুগালের এক গ্রামে রীতিমতো উদযাপন করে শিশুদের সিগারেট খাওয়ানো হয়। এ উৎসবের নাম ‘এপিফ্যানি’। এপিফ্যানি হলো খ্রিষ্টানদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব যাকে কেউ কেউ দ্বিতীয় বড়দিন বলে অভিহিত করে। তাদের মতে, এদিন প্রভু যিশু ধরাধামে ঈশ্বরের ছেলে এবং একজন অলৌকিক পথপ্রদর্শক হিসেবে নিজের পরিচয় নিয়ে জনসম্মুখে আত্মপ্রকাশ করেন।

 

সারা ইউরোপের জন্য ধর্মীয় এ উৎসব উপহার বিনিময় আর সাঁতার কিংবা গানবাজনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এমনকি পর্তুগালের  অন্যান্য গ্রামেও আর সবার মতো করেই খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরা এ উৎসব উদযাপন করেন নিয়ম করে। কিন্তু ব্যতিক্রম শুধু উত্তর পর্তুগালের ছোট্ট একটি গ্রাম। এখানে ‘এপিফ্যানি’ দিবস উপলক্ষে ‘ঈশ্বরের রূপ উদঘাটন’ চিহ্নিত করার অংশ হিসেবে ধরে ধরে বাচ্চাদের সিগারেট খাওয়ানো হয়। একটু অদ্ভুত এই রীতি নিয়ে ‘ভ্যালি সালগুইয়েরো’ গ্রামের খ্রিষ্টান পুরোহিতদের প্রধান কার্লোস কাদওয়েজ বলেন, ‘কেবল যারা এখানে বসবাস করে এবং থাকেন তারাই প্রকৃতপক্ষে এই ঐতিহ্যের মহত্ত্ব বুঝতে পারে।’


এমনকি কার্লোসের দশ বছরের মেয়ে লুসিয়াও প্রতি বছর তার সামনে বসে দুই-তিন প্যাকেট সিগারেট ফুঁকে দিয়ে দিবসটি পালন করে। কিন্তু এমন একটা উদ্ভট রীতির পেছনের রহস্যটা কী? জানা গেল সে ব্যাখ্যা দিতে মোটেই রাজি নন তিনি। এ নিয়ে কার্লোস বলেন, ‘আমি লোকজনকে আর বোঝাতে চাই না, আসলে বোঝানোর চেষ্টা করাটাই বৃথা। অনেকেই ভাবে আমরা বাবা-মা হিসেবে ভালো নই, কিংবা বোধ হয় মানুষ হিসেবেও ভালো না।’


ঐতিহ্যগতভাবে জানুয়ারির প্রথম শনিবার গ্রামের শিশুরা তাদের বাবা-মায়ের উপহার দেয়া সিগারেট টানে। বাবা-মায়ের সামনেই টানে। আর এটাকে খারাপ চোখে দেখেনও না সেখানকার স্থানীয়রা। গিলহারমিনা মাটিস সেই গ্রামের একজন দোকানদার। তিনি বলেন, ‘এই দিবসে আমি আমার ছেলেমেয়েদের সিগারেট দেই। তবে আমি এটার কারণ ব্যাখ্যা করতে পারব না। তাছাড়া আমি তো এর ক্ষতি দেখছি না। ওরা সিগারেটে টান দেয় আর দ্রুত ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। কেবল দিবসটিতেই তারা সিগারেট হাতে নেয়, অন্য কোনোদিন সিগারেট চায়ও না। আর যেহেতু এটা মাত্র এক দিনের ব্যাপার, তাই এ থেকে খারাপ কিছু হওয়ার কথা না।’


এমনকি ইতিহাসবেত্তারাও ঠিকঠাক জানেন না এই উৎসবের মাহাত্ম্য কী। হোসে রিবেরিনহা, যিনি ‘ভ্যাল দ্য সালগুইয়েরো’ গ্রামের এমন উদযাপন নিয়ে একটি বই লিখেছেন, তিনি শিশুদের সিগারেট খাওয়ানোর এই উৎসবকে অনেক পুরনো ঐতিহ্য হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করেছেন তার বইতে। কিন্তু এর পেছনের রহস্যটি অথবা কি চিন্তা থেকে এই উৎসবের সূচনা সেটা এখনও কিছু বের করতে পারেননি। তবে তার ধারণা সুদূর অতীতে মূল লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল বলেই হয়তো এ রকম একটি রীতি গড়ে উঠেছে এই গ্রামে। তিনি বলেছেন, ‘যখন একসাথে অনেক লোক একটি জায়গায় থাকা শুরু করে, সাধারণত তখন এ রকম লোকজ রীতি সময়ের আবর্তে একসময় বন্ধ হয়ে যায়। তবে এখানে কেন সেটা হয়নি এটাই ভাববার বিষয়।’


তবে দীর্ঘদিন ধরে চালু এই রীতিতে ধীরে ধীরে ক্ষতি হচ্ছে গ্রামের কিশোর-কিশোরীদের। কেননা প্রতি বছর ইউরোপে বহু মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তাদের মধ্যে অধিকাংশই অতিরিক্ত ধূমপানের ফলে কর্কট রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বলে চিকিৎসকদের মত। এমন প্রেক্ষাপটে পর্তুগালের একটি গ্রামে কী করে এমন রেওয়াজ চলছে, সেটা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে এমন সংস্থার কর্তা ব্যক্তিদের মনে।

মন্তব্য

উপর