রোহিঙ্গারা তো আমাদের মতই মানুষ, তাদের নিয়ে কিসের পিরিতের আলাপ আর বাজে মন্তব্য?

মোঃ মাইন উদ্দিন, দৈনিক প্রজন্ম ডটকম

প্রকাশিত: সন্ধ্যা ০৭:১৭, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৭, রবিবার | আপডেট: বিকাল ০৩:০৯, ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, সোমবার
রোহিঙ্গারা তো আমাদের মতই মানুষ, তাদের নিয়ে কিসের পিরিতের আলাপ আর বাজে মন্তব্য?

মোঃ মাইন উদ্দিন: মিয়ানমারে নির্যাতিত রোহিঙ্গারাদের জন্য তুরস্কের ফার্স্ট লেডি কিছু ত্রাণ নিয়ে বাংলাদেশে আসতেই "দাদাদের" মাঝে যখন শুরু হল পিরিতের আলাপ আর আজে বাজে মন্তব্য তখন কি আর আমি চুপ করে থাকতে পারি? অবশ্যই পারিনা।


কেননা রোহিঙ্গারাও আমাদের মতই মানুষ।


তবে রোহিঙ্গারা জাতিগত ভাবে কি সে কথায় না হয় পরে গেলাম কিন্তু আমরা তো জানি রোহিঙ্গারাও আমাদের মতই রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ।


আর সেই মানুষগুলোরে যখন জীব হত্যা 'মহাপাপ’এমন শান্তির বাণী উচ্চারণ ওয়ালারা নির্বিচারে মারছে  এবং ফেসবুকে রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে  সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করে নানান ধরণের স্ট্যাটাস দিচ্ছে, তখন কি আর কলম হাতে নিয়ে বসে থাকা যায়? মনে হয় যায় না।


তখনই কিছু না কিছু লিখতে হয়।


কিন্তু আমি জানি আমার এ লেখা পড়ার পর কিছু "দাদারা", আর কিছু জীব হত্যা 'মহাপাপ’ বাণী ওয়ালারা সংঙ্গে সংঙ্গে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠবে।


তবে যাইহোক যতই জ্বলেটোক আর জ্বলোক না কেন থাতে আমার কিছুই আসে যায় না।


কারণ রোহিঙ্গারা হচ্ছে সবচেয়ে অসহায়, নির্যাতিত, নিপীরিত জাতি ও মানুষ।


তিন'দিন আগে দেখলাম এ মানুষগুলোর জন্য যখন তুরস্কের ফার্স্ট লেডি কিছু ত্রাণ নিয়ে আসলো তখন অনেকের গা চুলকাইতে লাগলো।


আর এই চুলকানি দেখেই আজ রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে অজানা কিছু লিখতে আমার বড় ইচ্ছে হলো।


আমার মনে হয় আজ আর বিশ্ব সম্প্রদায়ের জানার বাকি নেই মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা যে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। 


দেশটি থেকে ইতোমধ্যেই কয়েক লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে পালিয়েও এসেছে।


তাছাড়াও দেশটিতে বেশ কিছু দিন ধরে চলমান সহিংসতা ও সেনাবাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানিও ঘটেছে।


এমন কি মিয়ানমারের নাফ নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসার সময় দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী অনেক রোহিঙ্গা মুসলিমকে পাখির মত গুলি করে হত্যা করেছে তাও আর কারোর অজানা নয়।


যদিও কারো অজানা থাকে তা হলে হয়তো সেটা থাকতে পারে দেশটির ৩০০ বছর আগের ইতিহাস।


আর চলমান ইতিহাস হয়তো মানুষকে এটুকুই স্বরণ করিয়ে দিতে পারবে, যা ২০১২ সালেও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা শুরু হয়ছিল।


সেই সহিংসতায়ও শত শত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।


কিন্তু সেই সহিংসতা পরবর্তীতে কিছুটা থামলেও মিয়ানমারের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির এনএলডির নতুন সরকারের মন্ত্রীসভাতে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচি স্থান পাওয়ার পর আবারও দেশটিতে ফের সহিংসতা শুরু হয়ে যায়।


যে সহিংসতা এখন আস্তে আস্তে মারাত্বক রূপ ধারণ করেছে।


সর্বশেষ অবস্থায় যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম "জীব হত্যা মহাপাপ’ বাণী ওয়ালাদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো টিক তখনই তুরস্কের ফার্স্ট লেডি রোহিঙ্গাদের জন্য কিছু ত্রাণ নিয়ে আসলো।


ফার্স্ট লেডি আসার পর দেখলাম অনেকের গা চুলকাইতে লাগলো।


শুধু তাই না, তারা আরো বলতে লাগলো তুরস্কের হেনতেন, এমন কি অনেক দুষ-ত্রুটিও খুঁজল এবং তুরস্কের আদি ইতিহাসও টেনে সামনে আনলো।


তুরস্ক কেন আসল? অন্য কোন দেশ কেন আসেনি আরো ইত্যাদি ইত্যাদি।


এখানে বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে আমার প্রশ্ন রইল, তুরস্ক আসলে "দাদা"দের সমস্যা কি? আমার তো মনে হয় যদি অন্য কোন দেশ বা সৌদিআরব ও ত্রাণ নিয়ে আসতো তাহলে তাদেরও দূষ-ত্রুটি খুঁজত এবং সমালোচনাও করত।


কারণ "দাদা"দের আচরণে এমনটাই বুঝা যায়, তারা চায়না যে এই অসহায় নির্যাতিত মানুষদের জন্য কেউ কিছু নিয়ে আসুক।


ওরা নিজেরা কোনদিনই অসহায় মানুষদের সাহায্য তো করেইনা বরঞ্চ যারা একটু সাহায্যের হাত বাড়ায় তা দেখে তাদের সহ্য হয়না।
আসলে এটা তাদের অভ্যাস সবসময় নেগেটিভ কথাবার্তা বলা।


ওদের মুখে সবসময় অসাম্প্রদায়িকতার বাণী শুনি।


আমার তো মনে হয় ওরাই সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক, যারা যে কোন মুসলিম রাষ্ট্রের সাহায্য সহযোগীতাকে বাঁকা চোখে দেখে।


অন্যদিকে তিন দিন আগে দেখলাম ওদের "দাদা" মানুষ হত্যা বন্ধের কথা না কইয়া অং সান সুচির লগে কি জানি পিরিতের আলাপ জমাইছে।
কই সেখানে তো কারো কোনো চুলকানি দেখলাম না!


আমার তো মনে হয় তোমরা মন থেকে যদি চুলকানি বন্ধ না কর তাহলে পৃথিবীর কোন মলমই তোমাদের চুলকানি কমাতে পারবেনা।


তাই আজ পূরোনো কিছু ইতিহাস পাঠকদের কাছে তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।


যদিও রোহিঙ্গাদের নিয়ে লিখতে গেলে প্রথমে লিখতে হয় রোহিঙ্গারা কোন জাতি ও কি তাদের পরিচয়। 


আমরা জানি বর্তমান মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা হচ্ছে মুসলিম এবং বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যহত একটি জনগোষ্ঠী।


এক সময় যাদের ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি, আজ তারাই হচ্ছে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার।


মিয়ানমারের বিগত দিনের ইতিহাস বলছে শত শত বছর ধরেই নির্যাতিত হয়ে আসছে মিয়ানমারের আরাকানে বসবসরত এই রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীটি।


তাদের ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে নিঃসন্দেহে আপ্লুত করবে এবং ভারাক্রান্ত করবে।


ইতিহাস সাক্ষি দেয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠেছিল, এমনকি স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এর মধ্যে আরাকান হচ্ছে অন্যতম।


আর আজকের রোহিঙ্গারাই হচ্ছে সেই আরাকানি মুসলমানদের বংশধর।


ইতিহাস আরো বলে, ঐ মধ্যযুগেই বাংলা সাহিত্যের এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল আরাকান রাজসভায় অমাত্য (মন্ত্রী) হিসেবে স্থান পান।


কারণ, সেই সময় এ সাহিত্যিক পদ্মাবতী, সয়ফুলমুলুক ও বদিউজ্জামালসহ আরো


বেশকিছু কাব্যগ্রন্থ লিখেছিলেন।


মিয়ানমারের ইতিহাস ও রোহিঙ্গা জনগোষ্টি সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায়, ১৪৩০ সালে আরাকানে প্রতিষ্ঠিত হওয়া মুসলিম শাসন প্রায় দুইশ বছরেরও বেশি সময় স্থায়ী হয়।


এ সময় মুসলমানরা সেই রাজ্যে আধিপত্য বিস্তার করে।


এর পর ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ না খেয়ে প্রাণ হারায়।


এ অবস্থার ফলে মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে।


পরবর্তী ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোঘল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে স্বপরিবারে হত্যা করে।


এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই শুরু হয় মিয়ানমারের মুসলমানের উপর অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন আর দমন-নিপীড়ন।


এসব দমন-নিপীড়ন ও দুর্বিষহ অবস্থার মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিনশ বছর জীবন কাটাতে হয় মুসলমানদের।


আবার ১৭৮২ সালে বর্মী রাজা বোধাওপায়ার আরাকান রাজ্য দখল করে নেন।


কিন্তু বর্মী রাজাও ছিলেন ঘোর মুসলিম বিদ্বেষী।


সে ক্ষমতা দখল করার কয়েক দিন পর বোধাওপায়ারাও ঢালাওভাবে মুসলিম নিধন করতে থাকেন।
নতুন করে শুরু হয় অত্যাচার আর শোষণের আরেক অধ্যায়।


আবাও ১৮২৮ সালে বার্মা ( বর্তমান মিয়ানমার) ইংরেজদের শাসনে চলে যায়।
পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে বার্মা স্বায়ত্ত্বশাসন
লাভের পর বৌদ্ধদের পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং তারা প্রায় ৩০ লাখ মুসলিমকে নৃশংসভাবে হত্যা করেন।


তখন নির্যাতিত মুসলিমরা কোনঠাসা হতে হতে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়।


অবশেষে ১৯৮১ সালে মিয়ানমারের সামরিক শাসনকর্তা ‘আরাকান’ রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে ‘রাখাইন’ প্রদেশ হিসেবে ঘোষণা করেন। নাম পরিবর্তনের পেছনে মূল উদ্দেশ্য এটাই বুঝানো হয় যে, এই রাজ্য বৌদ্ধ রাখাইন সম্প্রদায়ের, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নয়।


ইতিহাস বিকৃতির এক ঘৃন্যতম দৃষ্টান্ত ছিল এই নাম পরিবর্তনের পিছনে।


এখানেই শুধু শেষ নয়, তারা শত শত বছর ধরে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে বসবাস করে আসলেও মিয়ানমার সরকার তাদেরকে সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিও দেয়নি।


তাছাড়াও এ জাতিগোষ্ঠির পরিচয় নিশ্চিহ্ন করতে ১৯৮২ সালে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের নাগরিকতও্ব বাতিল করে দেয় এবং সরকারিভাবে তাদেরকে সেখানে বহিরাগত ‘বসবাসকারী’ হিসেবে উল্লেখ করেন।


এমনকি তাদের ভোটাধিকার, সাংবিধানিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়।


এতে করে নিজ দেশে পরবাসী হয়ে পড়েন ভাগ্যাহত- নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীটি।


তারা আরো মিয়ানমারের এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে অনুমতি ছাড়া যেতে পারবেন না মর্মে বিধিনিষেধও আরোপ করেন।


এসবের পর এক সময় যেখানে রোহিঙ্গারা ছিল সংখ্যাগুরু, আজ সেখানেই তারা হয়ে পড়ছেন সংখ্যালঘু।


ভাবতে বড় কষ্ট লাগে ভাগ্যের যে কি নির্মম পরিহাস, এখনও সেই রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মানুষ মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার।


আর জীব হত্যা 'মহাপাপ’এই শান্তির বাণী উচ্চারণ কারী মানুসগুলোই মানুষ হত্যাকারী।


সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তাদেরকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠি বলেও অভিহিত করছে মিয়ানমার সরকার।


অথচ রাখাইন রাজ্যে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শত শত বছর ধরে বংশপরম্পরায় সেখানে বসবাস করে আসছে।


এরকম একটি জনগোষ্ঠিকে তাদের নাগরিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে।


মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তার অধিবাসী মুসলমানদের জন্য সে দেশকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে।

তাদের থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছে উপার্জিত সব সম্পদের মালিকানা, নাগরিক অধিকার, মানবিক অধিকার, এমনকি বেঁচে থাকার অধিকারও।


আজ এসব রোহিঙ্গা মুসলিমরা যখন তাদের সবকিছু হারিয়ে বাংলাদেশে এসে ডুকেছে একটুখানি নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য, টিক তখনই কিছু "দাদা", জীব হত্যা 'মহাপাপ’ বাণী ওয়ালা ও কিছু ফেসবুক ওয়ালারা ফেসবুকে তাদেরকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে কটাক্ষ করে নানান ধরণের স্ট্যাটাস দিয়ে আসছেন।


যারা এসব স্ট্যাটাস দিচ্ছেন আমি এখন তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলছি।


আপনারা বলেন তো আপনার সামনে আপনার ভাই-বোন, মা-বাবা, ছেলে-মেয়েদের যদি আগুনে পুড়িয়ে ভস্মীভূত করে, শরীরের ওপর কামান তুলে মাথার মগজ বের করে ফেলে, নিস্পাপ শিশুটিকে ফুটবলের মতো লাথি দিয়ে হত্যা করে, চোখের সামনে আপনার ভাইয়ের তাজা দেহকে দ্বিখণ্ডিত করে ফেলে তখন আপনাদের কাছে কেমন লাগবে?


মিয়ানমারের মুসলমানদের উপর এ ধরনের নির্যাতন শুধু আজ নয়, শত শত বছর ধরেই করা হচ্ছে।


তাই আমি সকলকে অনুরোধ করছি কেউ ইতিহাসের সত্যতা যাচাই না করে কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে অযৌক্তিকভাবে রোহিঙ্গাদের প্রতি নির্দয় ও অসত্য তথ্য তুলে ধরবেন না।
‘রোহিঙ্গারা মুসলিম বলে তারা নির্যাতিত হচ্ছে এই বক্তব্যেকে যারা সাম্প্রদায়িক বক্তব্য বলছেন এবং রোহিঙ্গারা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমর্থন বঞ্চিত হচ্ছে এবং এসব কারণে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলেও দাবি করছেন তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, আপনারা একটুখানি ভেবে দেখুন আরাকান রাজ্যের সেই সংখ্যাগুরু মুসলমানরা কীভাবে আজ সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে, সেই ইতিহাসটা একবার জানার চেষ্টা করুন।


আমি আশা করি ইতিহাস জানলে তাদের ধর্মীয় পরিচয়টা আপনিও পেয়ে যাবেন।


আমরা তো বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খিস্ট্রান কেউ নির্যাতিত হলে সংখ্যালঘু হিন্দু, সংখ্যালঘু বৌদ্ধের উপর নির্যাতন করা হচ্ছে বলে বেশ লাফালফি শুরু করি।


কিন্তু মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য কোন মুসলিম যদি বলে সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর নির্যাতন হচ্ছে তা শুনলে  আপনারা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠেন কেন? রোহিঙ্গারা ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমর্থন বঞ্চিত হচ্ছে’ এই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আপনারা কাকে কি বুঝাতে চাচ্ছেন? ওরা মুসলিম বলেই কি আপনাদের মতো কথিত অসাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সমর্থন পাবে না এবং মুসলমানরা তাদের পাশে দাঁড়ালেই সেটা সাম্প্রদায়িক হয়ে যাবে? ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে ঐ অসহায় মানুষগুলোর পাশে দাঁড়াতে কোন মুসলমান কি আপনাদের বাঁধা দিয়েছে? সাম্প্রদায়িক শব্দটা কি আপনারা শুধু মুসলমানদের জন্যই বরাদ্ধ করে রেখেছেন নাকি? তাই যদি হয় তাহলে ইসলামের ইতিহাস পড়ে দেখুন না অন্তত জানতে তো পারবেন- মুসলমানদের মতো অসাম্প্রদায়িকতা, মানবতা, ন্যায়বিচার আর সহিষ্ণুতা কেউ দেখাতে পারে কিনা।


মিয়ানমারের নির্যাতিত মুসলিমদের পক্ষ নিয়ে কেউ কথা বললেও এটাকে দেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে উস্কানীমূলক বক্তব্য দেওয়ার যৌক্তিকতা কতটুকু? আপনাদের ভিতরে যেহেতু এত অসাম্প্রদায়িক চেতনা আছে তাহলে মুসলমানদের বাদ দিয়ে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্যপরিষদ করার পরও ‘সাম্প্রদায়িক সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করেন না কেন? এত মানবতার বুলি আওড়ান অথচ নির্বিচারে হত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের সম্মানে কোন এক চত্বরে সমবেত হয়ে এক মিনিটের জন্য কি নিরবতা পালন করেছেন?


কেন করেননি? তারা মুসলিম বলে? যদি না-ই করে থাকেন, বা নাই করেন তাহলে আর অযথা মুখে মানবতা আর অসাম্প্রদায়িক চেতণার ফেনা তুলবেন না।


সার্বিকভাবে আপনাদের সবকিছু বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে-‘আপনারাই হচ্ছেন মূলত সবচেয়ে বড় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী।’
আপনাদেরকে জাতিসংঘের এক কর্মকর্তার বক্তব্যটি স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি।


ঐ দিন জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘নিজের দেশ যাদের নাগরিকত্বের স্বীকৃতি দেয় না, প্রতিবেশীরাও যাদের গ্রহণ করতে চায় না তারাই হল রোহিঙ্গা।
জাতিসংঘের এ কর্মকর্তার বক্তব্যই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে মিয়ানমারের এই মুসলিমরাই সম্ভবত পৃথিবীর সবচেয়ে বন্ধুহীন জনগোষ্ঠী।

লেখক, সাংবাদিক।

সম্পাদকীয় এর আরও খবর