logo
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সকল খবর এক ক্লিকে পড়তে ক্লিক করুন

জহির পাগলাদের ইতিকথা! বুঝেনা নৌকা ধানের শীষ! শ্লোগান দেওয়াই এদের কর্ম


জহির পাগলাদের ইতিকথা! বুঝেনা নৌকা ধানের শীষ! শ্লোগান দেওয়াই এদের কর্ম

মোঃ মাইন উদ্দিনঃ
জহির পাগলাদের মতো প্রতিবন্ধীদের দেখলে প্রতিটা বিবেকবান মানুষের মনে কম বেশি মায়া লাগার কথা। কারণ তারা অসহায়। আর এমন অসহায় মানুষদের দুঃখ কষ্ট দেখলে বা শুনলে আমারও মায়া লাগে। তাই আজ মায়ার টানেই লেখতে বসলাম জহির পাগলাকে নিয়ে। 


জহির পাগলা বুঝেনা রাজনীতি, বুঝেনা আওয়ামীলীগ বিএনপি কাকে বলে। এমনকি সে জানেনা নৌকা, ধানের শীষ ও লাঙ্গল কোনটা কার মার্কা। সে শুধু নির্বাচনী প্রচারণার মিছিলে অন্যন্যদের সাথে শ্লোগান দিতে পারে। শ্লোগান দেওয়াই যেন তার কর্ম এনং শ্লোগান দিতে পারলেই সে খুশি।


আমি যেই জহির পাগলার কথা বলছি সেই জহির পাগলার বাড়ি চাঁদপুর। চাঁদপুর জেলার বৃহত্তর মতলব বিশেষ করে মতলব উত্তর উপজেলার আবালবৃদ্ধ সবাই তাকে তাকে জহির পাগলা নামেই চিনে।


জহির পাগলা সম্পর্কে যতটা জানতে পারলাম সে মানসিকভাবে অসুস্থ ও অত্যন্ত নিরীহ একজন মানুষ। এলাকার ছোট বড় সবাই তাকে ভালবাসে। বৃদ্ধরা তাকে নিজের সন্তানের মতো আদর স্নেহ করে। সবাই যেই জহির পাগলাকে আদর স্নেহ করে সেই জহির পাগলাকে কোনো মানুষ মারতে পারে বা শারীরিক আঘাত করতে পারে এমন কথা কল্পনাতীত। আর এমন কল্পনাতীত ঘটনাটিই বাস্তবে রূপ নিল গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কয়েকদিন আগে। জহির পাগলা তথাকথিত কিছু দুর্বৃত্তদের হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হলেন।


সেদিন জহির পাগলার নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে 'জহির পাগলার উপর হামলা কেন?' 'জহির পাগলার উপর হামলার খেসারত আওয়ামীলীগকে দিতে হবে' এমন শিরোনামে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয় বিভিন্ন অনলাইন নিউজ পোর্টালে। এর বাইরেও মতলব উত্তর উপজেলা এলাকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীদের ফেসবুকেও প্রতিবাদের ভাষায় লেখা স্ট্যাটাসের ঝড় উঠে। এসব সংবাদ ও স্ট্যাটাস পড়ে জানাযায় জহির পাগলা তার অভ্যাসগত কারণেই দেশে যেকোনো নির্বাচন হোক, স্থানীয় বা জাতীয় কিংবা সামাজিক সংগঠনের সে সেখানে ছুটে যাবেই। আর এই সংবাদ যে সে কোথা থেকে পায় তা শুধু জহির পাগলাই জানে। জহির পাগলা সেখানে গিয়ে নির্বাচনী মিছিলে যোগ দিয়ে সামনের সারিতে থাকে। কার মিছিল হচ্ছে তা সে বুঝেই হোক আর না বুঝেই হোক কিন্তু সবার সাথে সেও স্লোগান ধরে।


আমি আগেই বলেছি জহির পাগলা বুঝেনা আওয়ামীলীগ বিএনপি, সে জাতীয় পার্টি বা জামায়াত শিবির সম্পর্কেও জানে না। তবে মিছিলে গিয়ে মার্কা বলতে পারে।


আর মার্কা বলতে পারে বলেই সে মতলবের এমপি প্রার্থী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার নৌকা মার্কার শ্লোগান দিতো। আর এর আগে বিএনপি'র মরহুম নুরুল হুদার ধানের শীষের শ্লোগানও দিতো। এছাড়া এরশাদের লাঙ্গল মার্কার স্লোগান তার মুখে মুখে সব সময়ই থাকতো। তবে কেউ তারে আদর স্নেহ করুক বা না করুক কিন্তু কখনো কেউ তাকে শারীরিক নির্যাতন করেনি। এমনকি কেউ তাকে লক্ষ্য করে কটু কথাও বলেনি। সে রাত-বিরাতে একা একা হাটে। প্রকৃতিও হয়তো বুঝেছিল জহির পাগলা আরো আট-দশ জন স্বাভাবিক মানুষের মতো না। কিন্তু আমরা যারা নিজেদেরকে মানুষ হিসেবে দাবি করি বা বুঝি, আসলে তারাই বুঝলাম না জহির পাগলা যে আমাদের মতো না বরং এমন জহির পাগলারা যে হয় সহজ- স্বরল শিশুসুলভ হৃদয়ের অধিকারী।


অথচ সহজ- স্বরল শিশুসুলভ হৃদয়ের অধিকারী হয়েও এই জহির পাগলাই গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গত ১৫ ডিসেম্বর শনিবার যখন চাঁদপুর-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী ড. জালাল উদ্দিন আনুষ্ঠানিক ভাবে তার নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন তখন এ সংবাদ পেয়ে অন্যন্যদের সাথে জহির পাগলাও ছুটে যান জালাল উদ্দিনের গাড়ি বহরের কাছে। এ সময় ড. জালাল উদ্দিনের গাড়ি বহরে অর্তকিত হামলা করে তথাকথিত দুর্বৃত্তরা। হামলায় জালাল উদ্দিনের পক্ষের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়। সাথে সাথে সেখানে রণক্ষেত্র তৈরি হয়। আর এ হামলার সময়ও জহির পাগলা স্বভাব সুলভ ভাবে ‘ধানের শীষ, ধানের শীষ’ বলে শ্লোগান দিতে থাকেন। হামলাকারীদের হামলা যতই বাড়ছিল জহির পাগলার শ্লোগান ততই বাড়ছিল। আর এর কিছুক্ষণ পরেই ঘটে যত বিপত্তি। লাঠি দিয়ে সজোরে আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে দেয়া হয় জহির পাগলার। জহির পাগলা মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার রক্তাক্ত অবস্থা দেখে উপস্থিত নেতাকর্মীরা অবাক হয়ে যায়। জহির পাগলার আহত হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে গোটা এলাকায়। শুরু হয় আলোচনা- সমালোচনা। আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা জহির পাগলার উপর আঘাত করতে পারে তা কেউই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অবশেষে স্থানীয়রা মতলব উত্তর থানা পুলিশের সহায়তায় আহত জহির পাগলাক উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করে।


সেদিন জহির পাগলার আহত হওয়ার সংবাদটি ছিলো ‘টক অব দ্য মতলব’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার আহত হওয়ার ছবি দেখে অনেকেই বিরূপ মন্তব্য করেছিল। অনেকে প্রশ্ন তুলেছিল হামলাকারীদের মানষিকতা নিয়েও। এসময় স্থানীয় সুজাতপুর বাজারে এক ব্যক্তি বলেছিলেন, জহির পাগলার উপর হামলার খেসারত আওয়ামীলীগকে কোনো না কোনো একদিন দিতে হবে। জহির পাগলার প্রতি মানুষের যেরকম সিমপ্যাথী তৈরি হয়েছে তা হয়তো ক্ষমতাসীনদের জন্য বুমেরাং হবে। অন্য আরেক জন বলেছিলেন, জহির পাগলা যখন নৌকা নৌকা বলে শ্লোগান দিতো তখন তো তার উপর কেউ এমন নৃশংস হামলা করেনি।
সেদিন এমন মন্তব্য আরো অনেকেই করে ছিল।  কিন্তু মন্তব্য যে যতই করুক আর না করুক বস্তুত জহির পাগলাদের জীবন জিবিকা ও চিন্তাভাবনা নিয়ে সমাজের অনেকেই ভাবেনা। ভাবেন না তাদের ইতিকথা নিয়েও।


তবে আমি মনে করি মন্তব্য যে যাই করুক না কেন জহির পাগালার মতো অসহায় মানুষের উপর হামলা করা টিক হয়নি। যারা এমন পাগল ও অসহায়- গরিব দুঃখিদের উপর হামলা নির্যাতন করে তারা কেউ কখনো বড় হতে পারে না। কেননা বড় হতে হলে অবশ্যই অবশ্যই জহির পাগলাদের মতো অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়াতে হবে মমত্ববোধ নিয়ে।

লেখক, সাংবাদিক।

মন্তব্য

উপর