logo
Floating 2
Floating

ধান উৎপাদনে কৃষকের ভূমিকা এবং তাদের ভবিষ্যৎ


ধান উৎপাদনে কৃষকের ভূমিকা এবং তাদের ভবিষ্যৎ

সুমন মেহেদী:  বাংলাদেশ বিশ্বের ৪র্থ চাল উৎপাদনকারী দেশ। একসময়ের চাল আমদানি নির্ভর বাংলাদেশ আজ চাল রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা অর্জন করেছে। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০১৬ সালে বাংলাদেশ শ্রীলংকায় ৫০ হাজার মেট্রিক টন চাল রপ্তানি করে। স্বাধীনতার পর সাত কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান করা যেখানে দুঃসাধ্য ছিল এখন ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা মিটিয়ে চাল বিদেশেও রপ্তানি করা হচ্ছে। স্বাধীনতার পর দেশে যে পরিমাণ চাল উৎপাদন হতো, এখন উৎপাদন তার চেয়ে তিনগুণেরও বেশি। আবার মোট উৎপাদিত চালের ৫৫ ভাগই আসে বোরো ধান থেকে। বাকিটা আসে আউশ ও আমন থেকে। বিশ্বে বাংলাদেশই একমাত্র দেশ যেখানে এক বছরে একই জমিতে তিনবার ধান উৎপাদন করা সম্ভব। দারিদ্র্য নিরসনে বড়ো ধরনের ভূমিকা রাখছে দেশের উৎপাদিত চাল। কৃষি প্রবৃদ্ধি অন্য যে-কোনো সেক্টরের চেয়ে দারিদ্র্র্য নিরসনে তিনগুণ বেশি ভূমিকা রাখছে। আর এ সাফল্যের মূলে যারা রয়েছে তারা  হলো এদেশের খেটে খাওয়া কৃষক সমাজ।  


খাদ্য উৎপাদনসহ সকল সেক্টরে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বহুমুখী সমস্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও কৃষি খাতে এসেছে অভাবনীয় সাফল্য। দেশে এখন বছরে প্রায় ৩ কোটি ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন চাল উৎপাদন হয়। অল্প সময়েই খাদ্য উৎপাদনে ব্যাপক সাফল্য এনেছেন দেশের কৃষকরা। ধান উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে দেশের চাহিদা মিটিয়েও বিদেশে রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিট এর দৈনিক খাদ্যশস্য পরিস্থিতি, ২১ জানুয়ারি ২০১৯ এর হিসাব অনুযায়ী, খাদ্যশস্যের সরকারি গুদামজাত করা মোট মজুদ ১৪.৩১ লাখ মে. টন। এর মধ্যে চাল ১২.৭২ লাখ মে. টন ও গম ১.৫৯ লাখ মে. টন খাদ্যশস্যের কোনো ঘাটতি নেই, ঘাটতির সম্ভাবনাও নেই।

কৃষির উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও জীবিকার ধারা। নতুন নতুন ধানের জাত উদ্ভাবনে অর্থনীতির নতুন এক দিগন্ত দেখছে দেশবাসী। ধারাবাহিকভাবে এ সাফল্যের কারিগর এ দেশের লাখ লাখ সাধারণ কৃষক। কৃষকের শ্রম, কৃষি কর্মকর্তাদের তদারকি, কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও সরকারের সদিচ্ছায় ধান চাষ ও চাল উৎপাদনের এ রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ। আর এতে পাল্টে গেছে জাতীয় প্রবৃদ্ধি। জাতীয় পরিসংখ্যান অনুসারে, শুধু কৃষি খাতে জিডিপির অবদান ২১ শতাংশ। আর কৃষিশ্রমে ৪৮ শতাংশ। কৃষির সাব-সেক্টরসহ এ পরিসংখ্যান ৫৬ শতাংশ।

দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানোর বিষয়টি ভাবনায় এনে সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতা আমলের চাষাবাদ পদ্ধতি ছেড়ে উফশী ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় করে তোলা হচ্ছে। গবেষণায় বিশ্বে প্রথম জিঙ্কসমৃদ্ধ নতুন ধানের জাত উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে ব্রি (বাংলাদেশ রাইস রিসার্স ইনস্টিটিউট)। এর নাম ব্রি ৬২ ও ব্রি ৬৪। জিঙ্কসমৃদ্ধ ধানের চালে কেজিপ্রতি ২৪ মিলিগ্রাম জিঙ্ক রয়েছে, যা থেকে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ শরীরের চাহিদার ৪০ ভাগ জিঙ্কের ঘাটতি পূরণ করতে সক্ষম। তিন মৌসুমে চাষাবাদে রয়েছে খরাসহিষ্ণু, বন্যাসহিষ্ণু, লবণাক্ততাসহিষ্ণু, শীতসহিষ্ণু ধানের জাত। এতে ফলন, জীবনকাল ও বীজের মান পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে রাখা হয়েছে। আর এজন্য ধান গবেষণায় কৃষকের আস্থা ও বিশ্বে খ্যাতি অর্জন করেছে ব্রি।

বাংলাদেশি জিন বিজ্ঞানী ড. আবেদ চৌধুরী উদ্ভাবিত এক গাছে দুবার ধান ফলনের জিন এখনো সবাইকে অবাক করে দেয়। একই জমিতে একবার ধান চাষ করলে দুবার ফসল পাওয়া যাবে। প্রথমবার ধান কাটার পর ঐ গাছেই পুনরায় ধান হবে। মাত্র ছয় মাসেই কৃষকের ঘরে ফসল উঠবে দুবার। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার হাজীপুর ইউনিয়নের কানিহাটি গ্রামে ড. আবেদ পরীক্ষামূলকভাবে এ ধান চাষ করেন। জানা গেছে, একটি খেতে প্রথমে বোরো ধানের চারা রোপণ করে পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করতে হয়। সঠিকভাবে সেচ ও পরিচর্যার ১৩০ দিনের মধ্যে ৮৫ সেন্টিমিটার থেকে ১ মিটার উচ্চতার গাছে প্রথমবারের মতো ফসল (ধান) বেরিয়ে আসে। পরে মাটি থেকে ৩৫ সেন্টিমিটার উচ্চতায় পরিকল্পিতভাবে ওই ধান কেটে ফেলতে হয়। খেতে নতুন করে চাষাবাদ ছাড়াই পরিমাণমতো ইউরিয়া সার প্রয়োগ করে পরবর্তী ৫২ দিনের মাথায় দ্বিতীয়বার ফলন মেলে। প্রথমবার ধান কেটে নেওয়ার পর দেখা যায়, প্রতি হেক্টরে ছয় দশমিক চার টন এবং দ্বিতীয়বার তিন টন উৎপাদিত হয়। জনগনের সচেতনতা, বিজ্ঞানের আবিষ্কার, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কৃষকের ঘামের সমন্বয় ছাড়া কৃষিতে সাফল্য সম্ভব নয়। এসবের সমন্বয়েই আজ বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ।

সম্প্রতি চালের দাম বৃদ্ধি এবং এ নিয়ে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখালেখির দরুন বিষয়টি আলোচনায় আসে। কথায় আছে ভাতে-মাছে বাঙালি। তাই অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য বৃদ্ধি পেলেও তা মানুষের তেমন নজর কাড়ে না। কিন্তু চালের সামান্য মূল্য বৃদ্ধিতে চারিদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। যে কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলায়, নিত্য আমাদের খাবারের সংস্থান করছে, আমরা সেই কৃষকদের পরিশ্রমের যোগ্য মূল্য দিচ্ছি কী? বর্তমানে প্রতিটি দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে একজন কৃষককে ধান-চাল বিক্রি করে তার সংসারের প্রতিটি ব্যয় নির্বাহ করতে হয়। ছেলে-মেয়ের পড়ালেখা থেকে শুরু করে সংসারের প্রতিটি খরচ একজন কৃষককে ধান-চাল বিক্রি করে মেটাতে হয়। পাশাপাশি ধানের উৎপাদন খরচ পূর্বের চেয়ে বহুগুণ বেড়েছে। ২০১৮ সালের কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এক কেজি বোরো ধান উৎপাদনে কৃষকের খরচ হয়েছে ২৪ টাকা যা চালের হিসাবে এক কেজি বোরো চাল উৎপাদনে খরচ দাড়ায় ৩৬ টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ। ২১ জানুয়ারি, ২০১৯ তারিখের খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, মোটা চালের বাজার দর খুচরা মূল্য ৩৬-৩৮ টাকা, মধ্যমানের চাল খুচরা ৪০-৪৫ টাকা, সরু চাল খুচরা ৫২-৬২ টাকা। তবে এ তিন প্রকার চালের দাম জেলা ও বিভাগভেদে কিছুটা পার্থক্য আছে।

কৃষক যদি তার প্রাপ্য মূল্য না পায়, উৎপাদন খরচ তুলে আনতে না পারে তবে সে ধান আবাদে অনুৎসাহিত হয়ে পড়বে। তখন সে তার কৃষি জমিতে অন্য ফসল উৎপাদনের দিকে ঝুকে পড়বে। কৃষক যদি ধান উৎপাদন না করে তবে দেশ চাল আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে। তখন ১০০ টাকা কেজিতে মোটা চাল পাওয়া যাবে কি-না সন্দেহ। তাই চালের সামান্য দাম বৃদ্ধিতে অহেতুক সমালোচনা না করে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কৃষকের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে আমাদের চিন্তা করতে হবে এবং পদক্ষেপ নিতে হবে। কৃষকের উৎপাদনের ন্যায্য মূল্য দিতে হবে। তবেই বাংলার কৃষক ধান চাষে আরো উৎসাহিত হবে এবং দেশ ধান-চালে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ধরে রাখতে পারবে। দেশের ১৬ কোটি মানুষের প্রধান খাদ্য ভাতের যোগান দিতে সক্ষম হবে।

05@দৈনিক প্রজন্ম ডটকম /  জা.আ

মন্তব্য

উপর