logo
Floating 2
Floating

ভালোবাসা দিবস না হোক কারো জীবনের করুন গল্পকথা


ভালোবাসা দিবস না হোক কারো জীবনের করুন গল্পকথা

মোঃ মাইন উদ্দিনঃ
আসছে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস 'সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে'। প্রেম-ভালোবাসায় মাতোয়ারা হওয়ার দিন ১৪ ফেব্রুয়ারি। প্রকৃতির পালাবদলে এরই সাথে আসছে বসন্ত। বসন্তের সেই ফাগুনের মাতাল হাওয়ায় ভেসে যাবে প্রেমপিয়াসী তরুণ-তরুণী। সাথে ভালোবাসার রঙে রঙিন হবে হৃদয়। মনের যতো বাসনা, যতো অব্যক্ত কথা ডালপালা মেলে ছড়িয়ে পড়বে বসন্তের মধুর হাওয়ায়। কপোত-কপোতী পরস্পরকে নিবেদন করবে মনের যতো কথা, আর সাথে জানাবে ভালোবাসা। সেদিন চুপকথা শুনবার ও শোনানোর দিন। কারো কারোর চুপকথাগুলো হয়ে যাবে রূপকথা। এমনকি হতে পারে সারাজীবন মনে রাখার মতো গল্প। আর এমনই একটি ভালোবাসা দিবসের গল্প দিয়ে শুরু করলাম আজকের লেখা।

লেখার শুরুতেই বলছি আকাশ নামের এক যুবকের কথা। আকাশ ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০ টায় বিছানা থেকে উঠলো। ফ্রেস হয়ে নতুন পোষাক পড়ে বের হবে কোথাও। এমন সময় পাশের রুম থেকে মা ডাকছে- বাবা আকাশ একটু আমার কাছে আয়।
আকাশ:
পারবো না মা, আমার এখনি বেরুতে হবে।
মা:
আমার কেমন জানি লাগছে বাবা, কাল থেকে আমার অসুখটা বেড়ে গেছে। ঘরে ঔষুধ নাই। শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।
আকাশ:
তো আমি কি করবো?
মা:
তুই না বাবা গতকাল প্রথম বেতন পাইছোস, এই টাকা থেকে কিছু টাকা দিয়ে আমার জন্য ঔষুধ এনে দে না বাবা। তোর বাবা আজ ভোরে রিক্সা নিয়ে বের হয়েছে। ঘর ভাড়ার টাকা দিতে হবে আজকেই, তার উপর আবার আমার ঔষুধের টাকাও জোগাড় করতে হবে। মনে হয় রাতের আগে বাড়ি ফিরবে না তোর বাবা। ততোক্ষণ ঔষুধ না খেয়ে থাকলে আমি মনে হয় বাঁচবো না বাবা।
আকাশ:
না বাঁচলে মরে যাও। প্রথম বেতন পেয়েছি আর ওটাতেই তোমার চোখ পড়লো। যত্তোসব ঝামেলা...
ঘরে শুয়ে শুয়ে খাও আর সারাক্ষণ আমার আর বাবার সাথে ঘ্যান ঘ্যান করো, এই টাকা দিয়ে বন্ধুদের মিষ্টি খাওয়াতে হবে় (মূল বিষয় হলো এই টাকা দিয়ে তাঁর প্রিয়তমার জন্য ভালোবাসা দিবসের গিফট কিনবে আকাশ) বাবা আসার সময় ঔষুধ নিয়ে আসবে আমি গেলাম, আমাকে জরুরি কাজে যেতে হবে। এই বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেল আকাশ।
এদিকে দুঃখিনী মায়ের দু-চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি বেরিয়ে আসছে আর মনের দুখে বলছে, এই কি আমার ছেলে? আমি অসুখে মরার মতো অবস্থা দেখেও জরুরি কাজে যায়। ঔষুধ আনারর কথা বলাতেই বলে মরে যেতে পারনা।
আকাশের মা এসব ভাবছে আর ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আরো ভাবছে যেই ছেলেটাকে এতো কষ্ট করে মানুষ করলাম। এই গরীব সংসারে কতদিন কতবেলা নিজেরা না খেয়ে ওকে খাইয়ে পরিয়ে বড় করলাম। আজ আমাদের সেই খোকা নিজের আমাকে মৃত্যুশয্যায় ফেলে জরুরি কাজে চলে যায়। চাকরির প্রথম মাসের বেতন দিয়ে বন্ধুদের মিষ্টি খাওয়াবে। অসুস্থ মার ঔষুধ কেনার ইচ্ছা নাই। আর যে ভাবতে পারে না দুঃখী মা...
শ্বাসটা বন্ধ হয়ে আসছে। কখন যেন শেষ নিঃশ্বাস বের হয়ে যায়।
এদিকে আকাশ ভৈরবে পৌর শহরের নিউমার্কেটে ঢুকে তাঁর প্রিয়তমার জন্য সুন্দর একটা গোলাপ ও একটা গিফট কিনে নিলো। কেনা কাটার পর সে যখন মার্কেট থেকে বের হয় তখন রাস্তায় আসতেই দেখে তাঁর বাবা রিক্সা ঠেকিয়ে সামনে দাড়িয়ে আছে। আকাশকে দেখে বাবা বলেলো- বাবা আকাশ, তুমি তো কাল বেতন পাইছো, বাড়িতে যাওয়ার সময় তোমার মার জন্য ওষুধ কিনে নিয়ে যেও। কারণ আজ ২/৩ দিন হলো ঘরে ঔষুধ নাই। তোমার মার অবস্থা বেশি ভালো না। আমি ঔষুধ কেনার টাকা মনে হয় আজ জোগাড় করতে পারবো না। হয়তো ঘর ভাড়ার টাকা জোগার করতেই মনে হয় রাত হয়ে যাবে।
আকাশ:
আমার কাছেও টাকা নাই বাবা। তাছাড়া একটা জরুরি কাজে যাচ্ছি। আমার কাছে যে কিছু টাকা আছে ওটা দিয়ে নিজের খরচ চালাতে হবে। এই বলে বাবাকে পাশ কাটিয়ে চলে যায় আকাশ।
আকাশের বাবা তখন গামছা বের করে নিজের ঘামে ভেজা শরীরটা মুছলো। ঘাম মুছার সময় নিজের অজান্তেই বাবার চোখে পানি চলে এসেছিল আর ভাবছিল এই বুঝি আমার ছেলে? যাকে এতো কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়ে মানুষ করলাম। সারাজীবন রিক্সা চালিয়ে কখনো বুঝতে দেইনি খাওয়ার অভাব, পোষাকের অভাব। কখনো দোকানে বা হোটেলে খেতে বসে ছেলের কথা মনে পড়লে নিজে না খেয়ে বাড়িতে এনে ছেলেকে খাইয়েছি। এই বুঝি সেই ছেলে আমার...
বাবা আর ভাবতে পারেনা। বুকের ভিতরটা তছনছ হয়ে যাচ্ছে। তবুও রিক্সার প্যাডেলে পা রাখে আবার। তাকে যে আজ অনেক রাত পর্যন্ত রিক্সা চালাতে হবে। তবেই ঘর ভাড়া ও স্ত্রীর ওষুধের টাকা জোগাড় করা যাবে।
এদিকে প্রিয়তমার সাথে ভৈরব মেঘনা নদীর উপর জোড়া সেতু সংলগ্ন নির্ঝুম স্থানে বসে আনন্দময় মুহুর্ত কাটছে আকাশের। কখনো ফুচকা, কখনো হালিম, কখনো কোক, ঝালমুড়ি ও বাদামের অর্ডার দিচ্ছে, আর ভালোবাসা নামের ফস্টিনস্টি করছে প্রিয়তমার সাথে।
এভাবে কিছুক্ষণ ফস্টিনস্টি করার পর আকাশের পকেট প্রায় ফাকা হয়ে যায়।
আকাশ এবার বললো- জান এখন উঠি, তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে হবে।
প্রিয়তমা:
হা গো আমারও যেতে হবে।
আকাশ:
তাহলে চলো।
প্রিয়তমা:
তুমি যাও আমি পরে আসছি, একটুপরে আমার এক বান্ধবী আসবে এখানে আমি ওর সাথে যাবো।
আকাশ:
ওকে বায় জান।
প্রিয়তমা:
বায়।
আকাশ পার্ক থেকে বের হয়ে সিএনজিতে উঠতে যাবে এমন সময় হঠাৎ দেখে মানিব্যাগটা তাঁর পকেটে নেই। ভাবছে পার্কে হয়তো ফেলে এসেছে। সোজা দৌড়ে পার্কের গেটে যায় আকাশ। গেট খুলে একটু দৌড়ে সেই ঝোপের দিকে যায়। যেখানে তার প্রিয়তমার সাথে প্রেম চলছিলো। হঠাৎ দৌড় বন্ধ হয়ে যায় আকাশের। আকাশ ঝোপের দিকে চেয়ে দেখে সেই প্রিয়তমা আরেকটা যুবকের সাথে বসে তাঁর সাথে যা করছিল সেইসব করছে...
যেসব ভালোবাসা নামের অশ্লীল প্রেম একটু আগে আকাশের সাথেও করেছি এই মেয়ে। এসব দেখে আর দাড়িয়ে থাকতে না পেরে সাথে সাথে গেট দিয়ে বের হয়ে চলে এসে গাড়িতে উঠে আকাশ। গাড়িতে বসে ভাবে...
কোন ভালোবাসার জন্য আমার এতো অপেক্ষা ছিলো। কোন ভালোবাসার জন্য চাকরির প্রথম মাসের বেতনের টাকা দিয়ে আমার মার ঔষুধ না কিনে গিফট কিনলাম। কোন ভালোবাসার জন্য বাবাকে রাত পর্যন্ত রিক্সা চালাতে বাধ্য করেছিলাম। কোন ভালোবাসার জন্য অসুস্থ 
মৃত্যুপথযত্রী মাকে রেখে আসলাম। আকাশ এসব যতই ভাবছে ততই তাঁর কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। গাড়ি থেকে নেমে আসে আকাশ। যখন নেমে আসে তখন অনেক রাত হয়ে গেছে। এতো রাতে বাড়িতে ঢুকতেই বুকের ভিতর ধুক করে ওঠে আকাশের! এতো লোকজন কেন বাড়িতে? আকাশ লোকের ভিড় ঠেলে ঘরে ঢুকে দেখে দুটো লাশ পড়ে আছে। লাশ দুটি আকাশের বাবা ও মার।
বয়স্ক মানুষ ছিলো আকাশের বাবা। রাত জেগে গাড়ি চালানোর অভ্যাস তাঁর ছিলো না। কিন্তু স্ত্রীর ঔষুধ আর বাড়ি ভাড়ার টাকার জন্য রাতে গাড়ি চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করে মারা যায়। এদিকে স্বামীর ক্ষতবিক্ষত লাশ বাড়িতে আনার পর তা দেখে অসুস্থ মাও হার্ট এ্যাটাক করে মারা যায়।
আকাশ তাঁর বাবা-মার লাশের পাশে বসে কাঁদছে আর ভাবছে- এমনই কি হয় আমাদের চার পাশের বর্তমান অবস্থা? আমরা কি ভালোবাসা দিবসে আসল ভালোবাসার মানুষগুলোকে অবহেলা করে নকল ভালোবাসার পিছনে এভাবেই দৌড়ায়? যদি তাই হয়, তবে বলবো আর কোনো ১৪ ফেব্রুয়ারি "ভালোবাসা দিবস না হোক কারো জীবনের করুণ গল্পকথা। যেই গল্পকথা আমার মতো সারাজীবন কাউকে কাঁদাবে।

বিঃ দ্রঃ- গল্পটি সম্পুর্ণ কাল্পনিক।


07@দৈনিক প্রজন্ম ডটকম /  জা.আ

মন্তব্য

উপর