logo
Floating 2
Floating

মনিরামপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু; ক্লিনিকের মালিক আটক


মনিরামপুরে ভুল চিকিৎসায় প্রসূতির মৃত্যু; ক্লিনিকের মালিক আটক

যশোরের মণিরামপুরে মনোয়ারা ক্লিনিকে সন্তান প্রসব করতে এসে ভুল চিকিৎসায় এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় নিহত সামছুন্নাহারের স্বামী আসাদুজ্জামান বাদি হয়ে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। মামলার সূত্রধরে শনিবার রাতে পুলিশ ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে ক্লিনিকের মালিক কথিত সার্জিকাল চিকিৎসক আব্দুল হাইকে আটক করেছেন।

আটক আব্দুল হাই উপজেলার জামজামি গ্রামের মৃত আফসার আলী বিশ্বাসের ছেলে। তিনি নিজে ডাক্তার না হলেও সার্জিকাল ডাক্তার সেজে বহুদিন ধরে রোগীর স্বজনদের ধোঁকা দিয়ে আসছেন বলে অভিযোগ।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন, অভয়নগরের নওয়াপাড়া এলাকার সুব্রত মহলদার, উপজেলার কাজির গ্রামের শরিফুল ইসলাম, সুবলকাঠি গ্রামের সাইফুল ইসলাম, জয়পুরের মোন্তাজ হোসেন, স্বরুপদহ গ্রামের তানিয়া সুলতানা হালিমা, হাসাডাঙ্গার নাসিমা খাতুন, সদর উপজেলার সিরাজসিংহ গ্রামের দীপা খাতুন, রামনগরের মঞ্জুয়ারা খাতুন এবং আব্দুল হাইয়ের স্ত্রী মনোয়ারা খাতুন।

এদিকে ডাক্তার গ্রেফতার হওয়ার খবরে ক্লিনিকে ভর্তি হওয়া রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নিয়েছেন স্বজনরা। গ্রেফতার আতঙ্কে অন্য আসামিরা ক্লিনিক ছেড়ে পালিয়েছেন।

থানায় দায়ের করা এজাহারে উল্লেখ করা হয়, জয়পুর গ্রামের আসাদুজ্জামানের স্ত্রী সামছুন্নাহারের বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) রাতে প্রসব বেদনা উঠে। তখন সে তার স্ত্রীকে মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে অবস্থিত মনোয়ারা ক্লিনিকে ভর্তি করান। বাইরে থেকে ডাক্তার আনার কথা বলে সাড়ে ১১ হাজার টাকা চুক্তিতে সিজারের কথা বলে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই রোগীকে ভর্তি করান। কিন্তু রাত গড়ালেও কোন ডাক্তার আসেননি। অবশেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেই সার্জিকাল চিকিৎসক সেজে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকে সামসুন্নাহারের অপারেশন করান। সিজারিয়ানের মাধ্যমে সামছুন্নাহার একটি পুত্র সন্তান প্রসব করেন। আব্দুল হাইয়ের সহযোগীরা সেই নবজাতককে এনে পিতা আসাদুজ্জামানের কোলে দেন। আসাদুজ্জামান তার স্ত্রীর কথা জানতে চাইলে রোগী ভাল আছেন বলে জানান ডাক্তার। কিছুক্ষণপর মালিক আব্দুল হাই জানান, রোগীর অবস্থা খারাপ তাকে খুলনায় নিতে হবে। ঘন্টা দেড়েক পরে আবার ডাক্তার জানান খুলনায় নয় রোগীকে ওই মুহুত্বে যশোর সদর হাসপাতালে ভর্তি করাতে হবে। পরে ডাক্তারের কথামত রাত সাড়ে তিনটার দিকে আসাদুজ্জান ক্লিনিকের অ্যাম্বুলেন্সে করে স্ত্রীকে নিয়ে যশোরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ওই সময় অ্যাম্বুলেন্সে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাই নিজেও ছিলেন।

আসাদুজ্জামানের অভিযোগ, অ্যাম্বুলেন্সে উঠানোর সময় ভেতরে আলো বন্ধ করা ছিল। তিনি আলো জ্বালাতে বললে রোগীর ক্ষতি হবে বলে জানান ডাক্তার। অ্যাম্বুলেন্স কিছুদূর গেলে আব্দুল হাই আসাদুজ্জামানের দুই পা জড়িয়ে ধরেন। মালিক তাকে প্রলোভন দেখিয়ে বলেন, যদি রোগী মারা যান তাহলে তিনি (আসাদুজ্জামান) যেন কাউকে কিছু না জানান। তিনি নবজাতকের যাবতীয় দায়িত্ব নেবেন এবং আসাদুজ্জামানকে ক্লিনিকে চাকরি দেবেন। পরে অ্যাম্বুলেন্স কুয়াদা বাজার পার হলে ভেতরে আলো জ্বালিয়ে সামছুন্নাহারকে মৃত ঘোষণা করেন আব্দুল হাই।

এদিকে মণিরামপুর বাজারের ঘর মালিক বোরহান উদ্দিন জাকির বলেন, দুই-তিন বছর আগে আব্দুল হাই তার ঘর ভাড়া নিয়ে প্রথমে মনোয়ারা ক্লিনিক খোলেন। তখন হাকোবা গ্রামের এক রোগীর মৃত্যু হলে স্বজনরা ক্লিনিক ভাঙতে আসেন। পরে তিনি খবর নিয়ে জানতে পারেন, বিভিন্ন সময়ে ক্লিনিকে পাঁচ-সাত জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। এসব জেনে বোরহান উদ্দিন ক্লিনিক উঠিয়ে দেন। পরে মণিরামপুর সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় গেটে ঘর ভাড়া নিয়ে ক্লিনিক চালু করেন আব্দুল হাই। গত বছর ওই ক্লিনিকে উপজেলার কামালপুর গ্রামের সোনিয়া নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়। তখন মালিক আব্দুল হাই নবজাতকের দায়িত্ব নেবেন বলে রোগীর স্বজনদের হাত-পা জড়িয়ে ধরে রক্ষা পান। কিন্তু পরে আর তিনি সেই নবজাতকের খবর নেননি বলে অভিযোগ।

মণিরামপুর থানার ইন্সপেক্টর (সার্বিক) সহিদুল ইসলাম বলেন, আসাদুজ্জামানের অভিযোগের ভিত্তিতে শনিবার রাতে ক্লিনিকের মালিক আব্দুল হাইকে আটক করা হয়েছে। পরে অভিযোগটি হত্যা মামলায় রুপ নেয়। রোববার সকালে ১৫ জনকে আসামি করে থানায় হত্যাসহ বিভিন্ন ধারায় মামলা রেকর্ড হয়েছে। বাকি আসামিদের আটকের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ।

এদিকে মণিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শুভ্রা রানী দেবনাথ বলেন, সম্প্রতি মনোয়ারা ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ভূয়া ডাক্তার দিয়ে অপারেশন করানোর বিষয়ে ইউএনওর দপ্তরে একটি অভিযোগ পড়ে। আবার ক্লিনিকে রোগীর মৃত্যু নিয়ে উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানতে পারেন। এসব অভিযোগে শনিবার হাসপাতালের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত হয়। তদন্তে তিনি জানতে পারেন মালিক আব্দুল হাই নিজে ডাক্তার না হয়ে রোগীর অপারেশন করান। তাছাড়া সুব্রত নামে এক ইউনানী চিকিৎসককে এমবিবিএস সাজিয়ে ক্লিনিকে অপারেশন কাজ চালানো হয়। অভিযোগের ভিত্তিতে রোববারে (১৫ এপ্রিল) ক্লিনিক বন্ধ ঘোষণা করা হবে বলে জানান এই কর্মকর্তা।


দৈনিক প্রজন্ম ডট কম/ জো, ই/২০১৯/

মন্তব্য

উপর