logo
Floating 2
Floating

৩০০ কোটি টাকা পাচার তারেকর এপিএস অপুর, থলের বিড়াল বের হলো?


৩০০ কোটি টাকা পাচার তারেকর এপিএস অপুর, থলের বিড়াল বের হলো?

ব্যবসার কথা বলে বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৩৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) মিয়া নুর উদ্দিন অপু। হুন্ডির মাধ্যমে দুবাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে ওই অর্থ পাচার করেন তিনি। এর মধ্যে গত জাতীয় নির্বাচনের আগে ২৩ কোটি টাকা তিনি পাঠিয়েছেন লন্ডনে তারেক রহমানকে। পুরো অর্থ লেনদেনে ব্যবহার করা হয়েছে ৫৯০ জনের ব্যাংক হিসাব। অর্থের একটি অংশ তিনি গত নির্বাচনে ভোট কেনার কাজে ব্যয় করেন। এসংক্রান্ত মামলা তদন্ত করতে গিয়ে এসব তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র মতে, তদন্তে পাওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করতে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করছে সিআইডি। প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতায় এ বিষয়ে খোঁজ নেওয়া হবে।

তারেকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অপু একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুর-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন। গত ২৪ ডিসেম্বর মতিঝিলে ইউনাইটেড করপোরেশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আট কোটি টাকা উদ্ধার করার ঘটনায় করা অর্থপাচারের মামলায় অপুকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। পরে

তাঁকে রিমান্ডে (জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজত) নেয় র‌্যাব। এরপর মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক আশরাফুল ইসলাম জনান, অপুকে আরো দুই দফা রিমান্ডে নেওয়া হয়।

মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ বিভাগের বিশেষ সুপার মোল্লাহ নজরুল ইসলাম বলেন, মিয়া নুর উদ্দিন অপু ব্যবসার কথা বলে তিনটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে ৩৪০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে সেই টাকা তিনি বিদেশে পাচার করেছেন। তদন্তে এই তথ্যের পাশাপাশি তাঁর সম্পর্কে আরো অনেক অপকর্মের তথ্য পাওয়া গেছে।

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘ তদন্তে সিআইডি জানতে পেরেছে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে অপু ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের বনানী শাখা থেকে ২০০ কোটি, ইউনিয়ন ব্যাংক গুলশান শাখা থেকে ৯০ কোটি এবং এসআইবিএল থেকে ৫০ কোটি টাকা ঋণ নেন। ওই টাকা তিনি নিয়েছিলেন ব্যবসার কথা বলে। তবে ব্যবসায় ঠিকমতো কাজে না লাগিয়ে তিনি বিদেশে পাচারের পাশাপাশি গত নির্বাচনে বিএনপির পক্ষে ভোট কেনার কাজে ব্যয় করেন। ওই সময়ের মধ্যে লন্ডনে তারেক রহমানকে ২৩ কোটি টাকা দিয়েছেন অপু। এ ছাড়া গার্মেন্ট, সোনা ও মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসার আড়ালে হুণ্ডির মাধ্যমে দুবাই, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুরসহ কয়েকটি দেশে তিনি অর্থ পাচার করেন।

সিআইডির এক কর্মকর্তা জানান, বেশির ভাগ অর্থ দুবাইয়ে পাঠানোর কথা জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন অপু। সেখানে তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি গ্রুপ আছে। তাদের সঙ্গে অপরাধীচক্রের যোগাযোগ রয়েছে। এরা সোনা পাচারকারী চক্রেরও সদস্য। এদের মধ্যে সিঙ্গাপুরে আছে বুল নামে একজন। দিশাক, আমজাদ, মিলন, জুনায়েদ ও মানিক রয়েছে মালয়েশিয়ায়। এ ছাড়া জহিরুল ইসলাম, আমিরুল ইসলাম ও মাহমুদ ইসলাম নামের তিন ভাই অপুর অবৈধ অর্থ লেনদেন দেখাশোনা করত। এদের মধ্যে জহিরুল থাকে ফিলিপাইনে। এরাই বিদেশে থেকে হুণ্ডির টাকা গ্রহণ করত বলে তথ্য দিয়েছেন অপু।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, বিদেশে অর্থ পাচারের পাশাপাশি দেশের শেয়ারবাজারে জালিয়াতির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন, চট্টগ্রামের মহেশখালীতে ১০৮ কোটি টাকার এবং বির্জাখালে ১০৬ কোটি টাকার কাজ নিতে অপু মোটা টাকা ঘুষ দিয়েছেন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের। এতে মো. সালেহ নামে একজন তাঁকে সহযোগিতা করে। ময়মনসিংহের ভালুকায় ৭৮ একর জমি ছাড়াও চট্টগ্রামের মাঝিরঘাট এবং ঢাকার হাজারীবাগ ও পল্টনে জমি আছে অপুর। 

সিআইডির আরেক কর্মকর্তা বলেন, অপু ব্যাংক থেকে বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পর তাঁর ঘনিষ্ঠ ৫৯০ জনের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করার কথা জানিয়েছেন জিজ্ঞাসাবাদে। ওই ৫৯০ জনকেই অপুর তথ্য মতে পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ পর্যন্ত ২৫০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই হুন্ডি ব্যবসায়ী। দুবাইয়ের কিছু মানি এক্সচেঞ্জ অফিসের সঙ্গে এদের নিয়মিত যোগাযোগ থাকার তথ্য পাওয়া গেছে।

সিআইডি সূত্রে জানা যায়, অপুকে বিপুল অঙ্কের টাকা ঋণ পেতে সহযোগিতা করেছে প্রভাবশালী একটি গোষ্ঠী। এদের মধ্যে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদের লোকজন ছাড়াও অনেক রাজনৈতিক নেতাও আছেন। সেই সঙ্গে জামায়াত-শিবিরের অনেক নেতা অপুকে দেশের বাইরে পাচার করা টাকার সিকিউরিটি দিতে সহযোগিতা করেন বলে জানতে পেরেছে সিআইডি।

সূত্র মতে, ইউনাইটেড করপোরেশনে অভিযানের সময় সেখান থেকে উদ্ধার করা হয় চেক বই ও অপুর নির্বাচনী পোস্টার। ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বিভিন্ন ব্যাংকের মোট ১৮ কোটি টাকার চেক উদ্ধার করার কথা উল্লেখ আছে। ওই টাকা দিয়ে অপু নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তদন্তে উঠে এসেছে, অপু ধরা পড়ার আগে ইউনাইটেড করপোরেশন থেকে কয়েক শ কোটি টাকা লেনদেন হয়। বিদেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থ এসেছিল। মূলত বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীদের কাছে বিভিন্ন সময়ে ওই টাকা সরবরাহ করা হয়েছিল। নির্বাচনকেন্দ্রিক অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত তিনটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বিএনপির লোক। এগুলোর মধ্যে ইউনাইটেড করপোরেশনের মালিক মাহমুদুল হাসান। অপুর এই ঘনিষ্ঠ সহযোগীর বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালানের অভিযোগ আছে। আদালত থেকে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও রয়েছে। গত নির্বাচনের আগে অপুকে তিন কোটি ৬০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছিল ইউনাইটেড করপোরেশন থেকে। আরেক প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের মালিক আতিকুর রহমান ঝালকাঠি জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি।-কালের কণ্ঠ

মন্তব্য

উপর