logo
Floating 2
Floating
শিরোনাম

শাল্লার হাওরে লুটের রাজা সাবেক পাউবো’র এসও সমসের আলী


শাল্লার হাওরে লুটের রাজা সাবেক পাউবো’র এসও সমসের আলী

২০১৭ সালের অকাল বন্যায় হাওর তলিয়ে যাওয়ার পর কপাল খুলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও কর্মচারিদের। আর এই সুযোগে আঙ্গুল ফুলে কলা গাছ হয়ে যান সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২ এর শাল্লা উপজেলার সাবেক শাখা কর্মকর্তা মোঃ সমসের আলী মন্টু। 

২০১৭ সালের অনাকাঙ্খিত ঘটনার পর সরকার হাওরপাড়ের কৃষকদের ফসল রক্ষার জন্য নতুন নীতিমালা প্রনয়ন করেন। এই নীতিমালা অনুয়ায়ী তৈরি করা হয় ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের পিআইসি। ওই নীতিমালায় প্রকৃত কৃষকদের মাধ্যমে পিআইসি গঠন করে হাওরে বাঁধের কাজ করার কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু নীতিমালা প্রণয়ন হলেও বাস্তবে দেখা দেয় ভিন্ন রূপ। 

কৃষকদের নামে ফসলরক্ষা বাঁধের কাজে সরকারি কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ আসলেও এসব বরাদ্দ ভাগবাটোয়ারায় ব্যস্ত সিন্ডিকেট চক্র। আর এই চক্রের সাথে যোগসাজস ছিল সাবেক শাখা কর্মকর্তা উপ-সহকারি প্রকৌশলী সমসের আলী মন্টু’র। 

তিনি ২০১৮ সাল থেকে শাল্লায় যোগদান করার পর গঠন করেন একটি সিন্ডিকেট চক্র। আর এসব চক্রের সদস্যদের দ্বারা পিআইসি গঠন থেকে শুরু করে বিল উত্তোলনের ভাগটোয়ারায় অংশীদারিত্ব ছিলেন। আর এসব নিয়ন্ত্রনের জন্য স্থানীয় এক ব্যক্তিগত সহকারিও নিয়োগ দেন তিনি। এই সহকারির মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে পিআইসি গঠন করা এছাড়াও পিআইসির সদস্যরা কাজের বিপরীতে প্রথম বিল থেকে শুরু করে চতুর্থ বিল উত্তোলনের সময়ও ঘুষের পার্সেটিজ নিতেন তিনি। 

প্রতি বছরের ন্যায় এবছরও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পিআইসি বন্টন করেছেন। 

এছাড়াও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পকে প্রয়োজনীয় বলে অনুমোদনও দিয়েছেন। শুধু তাই নয় টাকার বিনিময়ে কোনো কোনো পিআইসি’তে বরাদ্দও বেশি বেশি দিয়েছেন। অর্থাৎ ইষ্টিমেটে অতিরিক্ত অর্থ দেখিয়েছেন। অভিযোগ আছে কোনো কোনো পিআইসি টাকা না দেওয়ায় তাদের বরাদ্দ কম হয়েছে। এ ধরনের অনেক অভিযোগ রয়েছে সমসের আলী মন্ট’ুর বিরুদ্ধে। তবে বাঁধ নির্মাণে আগের ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে পিআইসি গঠন করায় লুটপাটের মহোৎসব বৃদ্ধি পেয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে না নিয়ে প্রকৃত কৃষকদের দ্বারা পিআইসি গঠন করা হলে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ সঠিকভাবে হতো বলে মনে করেন সচেতন মহল।  ২০১৯-২০ অর্থ বছরে শাল্লায় ১৩৭টি হাওররক্ষা বাঁধের নামে ২৪ কোটি টাকার বরাদ্দ আসে। 

প্রকল্প অনুমোদন থেকে শুরু করে ওয়ার্ক অর্ডার পর্যন্ত শাল্লার দায়িত্বে ছিলেন শাখা কর্মকর্তা সমসের আলী। এরমধ্যে জানতে পারেন সমসের আলীকে জেলার দোয়ারাবাজার উপজেলায় বদলী করা হবে। সেই সুযোগে টাকার বিনিময়ে বেশির ভাগ প্রকল্পেই বরাদ্দের পরিমান বাড়িয়ে গেছেন তিনি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে গত বছরের বাঁধ অক্ষত থাকলেও এবছর ২৪০ মিটারে ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। আবার কোনো কোনো ক্লোজারে ৬০০ মিটারে বরাদ্দের পরিমান ১০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ টাকা দিতে পারেনি বলে বরাদ্দের পরিমানও বাড়াতে পারেনি কিছু কিছু পিআইসির লোকেরা।  পাউবো সুত্রে জানা যায়, বরাম হাওর উপ-প্রকল্পে  ১৪নং পিআইসি’র সভাপতি প্রানেশ চন্দ্র দাসের বাঁধে ১৯৮ মিটারে ১৬ লাখ ১১ হাজার ৬৪ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অথচ ইহা গত বছরের অক্ষত একটি বাঁধ। আবার একই হাওরের ১৩নং পিঅইসি’তে বরাদ্দ ৫১৬ মিটারে ১৬ লাখ ১৬ হাজার ৭শ ২৭ টাকা দেয়া হয়েছে। এই দুই বাঁধের কাজ একই রকম। আবার ১৫নং পিআইসি’র সভাপতি গুনেন্দ্র চন্দ্র দাসের ১৯৭ মিটারে বরাদ্দের পরিমান ১৬ লাখ ৫৯ হাজার ১শ ৯৬ টাকা দেয়া হয়েছে। এই বাঁধটিও গত বছরের অক্ষত ছিল। শুধু এখানেই থেমে নয়, ভান্ডারবিল উপ-প্রকল্পের ১৯ নং পিআইসি’তে ২৩৩ মিটারে বরাদ্দের পরিমান ১৭ লাখ ৮১ হাজার ৩ টাকা। ওই বাঁধটি একজন রাজনৈতিক নেতার ছত্রছাঁয়ায় রয়েছে। যার ফলে বরাদ্দের পরিমানও বেশি। শুধু তাই নয় এ বাঁধে নীতিমালার তোয়াক্কা না করে দায়সাড়া ভাবে কাজ করছেন প্রকল্পের সভাপতি গনেশ দাস। যেখানে ২ ফুট পর পর দুরমুজ করার কথা রয়েছে সেখানে এসব কিছু না করেই তড়িগড়ি করে বাঁধের কাজ শেষের দিকে নেয়া হয়েছে। একই হাওরের ২৩নং পিআইসি’র ২৪০মিটারে বরাদ্দের পরিমান ২০লাখ ৫৩ হাজার ১শ ৬৪ টাকা। স্থানীয়দের মন্তব্য এ বাঁধে এত বরাদ্দের প্রয়োজন ছিল না। তবে প্রকল্পের সভাপতি অভিনয় দাস নিময়নীতির তোয়াক্কা না করেই বাঁধের কাজ করছেন। এদিকে ২৭নং পিআইসি’র পুরো বাঁধই গত বছরের অক্ষত রয়েছে। তবে স্থানীয় এক সাংবাদিকের মুখ বন্ধ করতে ওই পিআইসি’তে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৯ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪ টাকা। অথচ ওই সাংবাদিকের ভাই বাহাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা হয়ে কাজ করছেন উপজেলার হবিবপুর ইউনিয়নে।  ভেড়াডহর হাওরের ৪১নং প্রকল্পটি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় বলে জানান এলাকাবাসি। তারা আরো জানান যে, ভরা বর্ষা মৌসুমে ওই প্রকল্প এলাকায় মোটর সাইকেল চলাচল করে। এ অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ১৮ লাখ ৫৪ হাজার ৮শ ৮১ টাকা। 

ওই পিআিিস’র সভাপতি নরেশ অধিকারীর সাথে এসও সমসের আলীর সুসম্পর্ক থাকায় অপ্রয়োজনীয় বাঁধটি প্রয়োজনীয় বলে অনুমোদন দেয়া হয়েছে। অপরদিকে ছায়ার হাওরের ৯৮নং পিআইসি’র সভাপতি প্রদ্যুৎ দাস। তিনি উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা বিধুর দাসের ভাই হওয়ায় প্রকল্প এলাকায় জমি না থাকা সত্তে¡ও সভাপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। ওই বাঁধটিও অপ্রয়োজনীয় বলে জানান মনুয়া গ্রামের কয়েকজন কৃষক। অথচ ৪৮০ মিটারে বরাদ্দ ১৫লাখ ১৩হাজার ১শ ৪৩ টাকা। উপজেলা জুড়ে সকল হাওরেই বরাদ্দের পরিমান নিয়ে রহস্যজনক ঘটনা তৈরি করেছেন এসও সমসের আলী মন্টু। উপজেলার কান্দিগাও গ্রামের কৃষক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি আব্দুস সাত্তার মিয়া বলেন, রক্ষক যেখানে ভক্ষন সেখানে আমরা সাধারণ কৃষক কি করবো ? হাওরের বরাদ্দের নামে হরিরলুট চলছে। প্রকৃত কৃষকদের পিআইসি না দিয়ে এসও’র মনোনীত ব্যক্তিদেরকে পিআইসি দেয়া হয়েছে। আর টাকার বিনিময়ে পিআইসিদের বরাদ্দের পরিমানও বাড়িয়ে দিয়েছে এসও শমসের আলী মন্টু। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পিআইসি’র সভাপতি বলেন, উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা আমাদেরকে শুধু নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার কথা বলেন। নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগই থাকে না। যেখানে বরাদ্দ দেয়া হয় ১২লাখ টাকা সেখানে ভাগ-বাটোয়ারা দিতে দিতে বরাদ্দের পরিমান চলে আসে ৮লাখ টাকায়। পিআইসি গঠন করার সময় এসও কে দেওয়া লাগে এক লাখ টাকা। এরপর প্রতিটি বিল উত্তোলনের সময় ৫০হাজার করে দিতে হয়। না হলে বিল উত্তোলন বন্ধ করে দেয়। এধরনের চলতে থাকলে কোনো পিআইসি’র লোকেরাই সঠিকভাবে কাজ করতে পারবে না। 

এ বিষয়ে শাল্লার সাবেক শাখা কর্মকর্তা ও উপ সহকারি প্রকৌশলী সমসের আলী মন্ট’ুর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বক্তব্য দেয়া সম্ভব হয়নি। কারন তিনি ফোন রিসিভ করেননি। 

এব্যাপারে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (পওর-২) শফিকুল ইসলাম বলেন, শাল্লার হাওরের এসব বিষয়গুলো নিয়ে জেলা প্রশাসকের মতবিনিময়ে মন্ত্রী মহোদয়ের সামনে স্থানীয় সাংবদিকরা তুলে ধরেছেন। এসব বিষয়গুলো তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। আর যেগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প তা চিহ্নিত করে বাতিল করা হবে। তবে লিখিত অভিযোগ পেলে আমাদের ব্যবস্থা নিতে সহজতর হবে।

মন্তব্য

উপর