logo
Floating 2
Floating

করোনার মত মহামারী প্রতিরোধে ইসলামে অজুর গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা


করোনার মত মহামারী প্রতিরোধে ইসলামে অজুর গুরুত্ব নিয়ে কিছু কথা
বিশ্বজুড়ে ঘরে অসস্থান কিংবা লকডাউনের আওতায় এসেছে ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ। নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণজনিত বৈশ্বিক মহামারী কভিড-১৯ এর প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে আঞ্চলিক ও সার্বিক লকডাউনের ঘোষণা দিয়েছে ৫০টিরও বেশি দেশ। এর মধ্যে কিছু দেশের সরকার এ লকডাউনকে করেছে বাধ্যতামূলক। অন্যরা শুধু নাগরিকদের ঘরে অবস্থান ও কোয়ারান্টাইনে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কিন্তু কোয়ারান্টাইন থেকে লকডাউন, লকডাউন থেকে কারফিউ যতই দিচ্ছে মূলত এতে কোনো কিছুই হচ্ছেনা দিনদিন শুধু বেড়েই চলে এর ভয়াবহতা।
মূলত চীনের উহান থেকে উদ্ভুত হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে প্রাণঘাতী এই করোনাভাইরাস।
ভাইরাসে  বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিন বেড়েই চলেছে। আমাদের বাংলাদেশেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে অনেকে। বেশ কয়েকজন মারাও গেছে। এতে  জনজীবনে নেমে এসেছে আতঙ্ক। তাই আপাতত জনসমাগম কমাতে ও সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখতে  সারাদেশে মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী। পাশাপাশি বন্ধ করা হয়েছে গণপরিবহন। কোয়ারেন্টইনের আওতায় আনা হয়েছে হাজার হাজার প্রবাসী ও তাদের সংস্পর্শে থাকা আরো হাজার হাজার মানুষকে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় সরকারিভাবে নেওয়া হয়েছে নানা উদ্যোগ। একই সাথে ঘন ঘন হাত ধুতে বলছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে হাতের মাধ্যমেই এই রোগ বেশি ছড়াতে পারে। যার ফলে বলা হয়েছে ঘন ঘন হাত-মুখ ধৌত করা হলে এ ভাইরাস আক্রমণ করতে পরবে না। কেননা এটা অত্যন্ত ছোয়াছে রোগ। 
অপরদিকে মুসলিম ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আলেমগন বলছেন, করোনা থেকে বাঁচতে আমাদের সর্বপ্রথম মহান আল্লাহর কাছে তাওবা করতে হবে। গুনাহ ছেড়ে দিতে হবে। কেননা মহানবী (সাঃ) বলেছেন, যখন কোনো জাতির মধ্যে প্রকাশ্যে অশ্লীলতা ব্যাপক হয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে দুর্ভিক্ষ অথবা মহামারী ব্যাপক আকার ধারণ করে, যা তাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে ছিল না।
[ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯]

অতএব, করোনার মত মহামারী প্রতিরোধে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে ব্যাপক পরিসরে গুনাহকে বর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ। 

আজ করোনা প্রতিরোধে যদিও সরকারিভাবে নানারকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু একই পরিস্থিতিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগন করোনার সংক্রমণ টেকাতে বারবার হাত-মুখ ধোয়ার উপরেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন, যা ইসলামেও বিদ্যমান।

ইসলাম ধর্ম সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে নামাজকে। ধর্ম বিশ্লেষকদের মতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে অজু করা এবং অন্য সময়েও ঘন ঘন অজুর মাধ্যমে আমরা উপকার লাভ করতে পারি। কারণ মহান আল্লাহ অজু করার সময় এমন চারটি অঙ্গকে ধোয়া ফরজ করেছেন, যে চারটি অঙ্গের মাধ্যমে শরীরে দ্রুত নানা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা, যখন তোমরা নামাজে দণ্ডায়মান হতে চাও, তখন তোমাদের মুখ ও কনুই পর্যন্ত হাত ধৌত করো, মাথা মাসেহ করো এবং টাখনু পর্যন্ত পা ধৌত করো।

[সূরা মায়েদা, আয়াত: ৬]

উল্লিখিত আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পবিত্রতা অর্জনের জন্য চারটি অঙ্গ ধৌত করা ফরজ করেছেন। কনুই পর্যন্ত হাত, পুরো মুখ, টাখনু পর্যন্ত পা ও মাথা মাসেহ করা। পাশাপাশি যে পানি দিয়ে পবিত্রতা অর্জন করবে, সেই পানিও হতে হবে পরিষ্কার ও স্বচ্ছ। যে পানির স্বাদ, গন্ধ এবং রং অবিকৃত থাকবে।

এ ছাড়া অজুর শুরুতে কবজি পর্যন্ত দুই হাত ধোয়া, কুলি করা, দাঁত মিসওয়াক করা, কান ও নাকের বহির্ভাগ পরিষ্কার করাকে মহানবী (সাঃ) তাঁর সুন্নাত হিসেবে অনুসরণ করতে বলেছেন। নিম্নে বিজ্ঞানের আলোকে অজুর অঙ্গগুলো ধোয়ার উপকারিতা তুলে ধরা হলো-

মুখমণ্ডল ধৌত কারা :

মুখ ধোয়ার অভ্যাস সব ঋতুতেই শরীর ও মনের সতেজতা আনে। মুখমণ্ডল ও দুই হাত শরীরের সবচেয়ে বেশি আবরণমুক্ত অংশ। তাই এগুলোতে সহজেই ধুলাবালি, ভাইরাস ও রোগজীবাণু লাগতে পারে। আর মানুষের ত্বকে বিশেষ করে লোমকূপের গোড়ায় এবং ঘর্মগ্রন্থির মুখে স্ট্যাপলিলোকাই, স্ট্রেপটোকক্কাই, কলিফর্ম ইত্যাদি ক্ষতিকর রোগজীবাণু থাকতে পারে।

তাছাড়া চোখের ভ্রুযুগল, চোখের পাতা, গোঁফ, দাড়ি, যা সহজেই ময়লাযুক্ত হতে পারে তাও হাত-মুখ ধোয়ার মাধ্যমে পরিষ্কার হয়ে যায়। মুখমণ্ডল অপরিষ্কার থাকলে রোগজীবাণু সহজেই মুখে প্রবেশ করতে পারে। মুখমণ্ডলের ঘাম, ময়লা ও জীবাণু ত্বকের সঙ্গে সেঁটে থাকতে সাহায্য করে। তাই আমরা ঘন ঘন অজুর মাধ্যমে আমাদের মুখমণ্ডলকে জীবাণুমুক্ত রাখতে পারি।

কনুই পর্যন্ত দুই হাত ধোয়া :

স্বাভাবিক কাজকর্মের জন্য শরীরের এই অংশটুকু প্রায়ই খোলা থাকে, যার ফলে এ অংশে ময়লা ও রোগজীবাণু লাগতে পারে। হাতের আঙুলের ডগার মাধ্যমে বিশেষ করে চুলকানোর পর আঙুল, নাক, কানসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে এসব জীবাণু বিস্তার লাভ করে। এ ছাড়া অপরিষ্কার হাত খাদ্য ও পানীয়কেও জীবাণুযুক্ত করতে পারে। তবে সুস্থ ত্বক এসব জীবাণুর জন্য এক স্বাভাবিক প্রতিরোধক।

কিন্তু ত্বকে সামান্যতম ক্ষত হলে তার মাধ্যমে এসব জীবাণু দেহের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং এর ফলে পাঁচড়া, ফোড়া, কারবাংকন, সেলুলাইটিস, সেপটিকেনিয়া, পায়োমিয়া ইত্যাদি রোগ হতে পারে। আর এখনকার সময় এর মাধ্যমে করোনাভাইরাস ছড়ানোর আশঙ্কাও খুব বেশি। সুতরাং অজু করার সময় প্রথমে ভালোভাবে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে পরে মুখমণ্ডল ধৌত করলে করোনার মত এসব রোগ থেকে সহজেই মুক্ত থাকা সম্ভব।

মাথা মাসেহ করা :

অজু করার সময় ভেজা হাতে মাথা মাসেহ করা ফরজ। রোগজীবাণুমুক্ত থাকতেও এ কাজটি দারুণ কার্যকর। কারণ আমাদের মাথা ও চুল সব সময় উন্মুক্ত থাকে। যার ফলে চুলের মধ্যে ময়লা ও রোগজীবাণু জমা হতে পারে। সুতরাং ভেজা হাতে মাথা মাসেহ করার মাধ্যমে সেই ময়লাগুলো পরিষ্কার করা সম্ভব। মাথা মাসেহ করার পাশাপাশি ঘাড়েও ভেজা হাত দিয়ে মাসেহ করে নেওয়া রাসুল (সাঃ)-এর সুন্নাত। এর দ্বারা অজুর একটি সুন্নত যেমন আদায় হয়ে যায়, পাশাপাশি ঘুম থেকে উঠে বা কর্মক্লান্ত হলে ভেজা হাতে ঘাড় মাসেহ করলে সতেজতা অনুভূত হয়।

টাখনু পর্যন্ত দুই পা ধৌত করা :

দুই পা সবচেয়ে বেশি খোলা থাকে, বিশেষ করে গ্রীষ্মপ্রধান দেশে। এর ফলে এই অংশ খুব ময়লা ও জীবাণুযুক্ত হতে পারে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পা থাকলে জামাতে নামাজ পড়ার সময় ময়লা বা রোগজীবাণু ছড়াতে পারে না।

তাই অজুর মাধ্যমে ভালোভাবে পা ধোয়ার মাধ্যমেও আমরা করোনা ভাইরাস থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করতে পারি। কারণ কোনোভাবে যদি আমাদের পায়ে করোনার জীবাণু লেগে যায়, তা খুব সহজেই হাতে উঠে যেতে পারে।

করোনা ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য আমরা অবশ্যই মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইব। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব। পাশাপাশি সতর্কতাও অবলম্বন করতে হবে।

কারণ আমি মনে করি আল্লাহ'র কোরআন যেমন সত্য ঠিক তেমনি সত্য আল্লাহ'র রহমত ও গজব। তবে মুসলমানদের জন্য এ গজব নয়। সহিসুদ্ধভাবে অজু করে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করলে করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে আমরা মুক্ত থাকবো 'ইনশাআল্লাহ।'

আল্লাহ'র দোহায় করোনা ভাইরাস আতংক হওয়ার কিছুইনা। কোরআনে আছে "পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ"। 
আসুন আমরা সবাই করোনা প্রতিরোধে সতর্কতা অবলম্বন করি, যতটা সম্ভব ঘরে থাকি, অন্যের সংস্পর্শতা এড়িয়ে চলি এবং সরকারের বিধিনিষেধ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে চলি।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই মহামারি থেকে রক্ষা করুন, "আমিন"।

লেখক, মোঃ আমজাদ হোসেন সরকার, কুলিয়ারচর, কিশোরগঞ্জ। 

মন্তব্য

উপর